
শঙ্খ ঘোষ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। পড়াশোনা করেছেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তী জীবনে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন।
১৯৫৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’-র মধ্য দিয়ে তাঁর কবিজীবনের সূচনা হয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে ‘নিহিত পাতাল ছায়া’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’, ‘ধূম লেগেছে হৃৎ কমলে’, ‘গোটা দেশজোড়া জউঘর’, ‘প্রতি প্রশ্নে কেঁপে ওঠে ভিটে’, ‘হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ’-সহ আরও অনেক কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কবিতায় সমাজ-বাস্তবতা, রাজনৈতিক চেতনা এবং মানবিক সংবেদনশীলতা এক অসাধারণ সমন্বয়ে মিলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব স্বীকার করেও তিনি নিজস্ব স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন।
শিশুসাহিত্যেও শঙ্খ ঘোষের অবদান উল্লেখযোগ্য। ছোটোদের জন্য তিনি লিখেছেন ‘ছোট্ট একটা স্কুল’, ‘অল্পবয়স কল্পবয়স’, ‘সকালবেলার আলো’, ‘সুপুরিবনের সারি’, ‘শহর পথের ধুলো’ প্রভৃতি। এছাড়া ‘কুন্তক’ ছদ্মনামে ভাষা ও শব্দ নিয়ে রচনা করেছেন ‘শব্দ নিয়ে খেলা’ ও ‘কথা নিয়ে খেলা’ — যা পাঠকমহলে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি সমান পারদর্শী। রবীন্দ্রসাহিত্যের গভীর পাঠক ও ব্যাখ্যাতা হিসেবে তাঁর ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’ বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে একটি মাইলফলক। এছাড়াও ‘ছন্দোময় জীবন’, ‘ভিন্ন রুচির অধিকার’, ‘এই শহরের রাখাল’, ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’, ‘এ আমির আবরণ’, ‘ছন্দের বারান্দা’ প্রভৃতি প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলা সাহিত্য-সমালোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাহিত্যকৃতির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, কবীর সম্মান, সরস্বতী সম্মান এবং ভারত সরকারের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ। ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পরেও তিনি বাংলা কবিতার আকাশে এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।
বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ
| বইয়ের নাম | বিষয়বস্তু |
|---|---|
| দিনগুলি রাতগুলি | প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ |
| বাবরের প্রার্থনা | রাজনৈতিক চেতনা ও ইতিহাস |
| নিহিত পাতাল ছায়া | অস্তিত্ববাদী ও সামাজিক ভাবনা |
| মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে | ভোগবাদ ও আধুনিক পরিচয় সংকট |
| পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ | মানবিক সংগ্রাম ও প্রতিরোধ |
| জলই পাষাণ হয়ে আছে | সামাজিক কাঠিন্য ও মানবিক আবেগ |
| ধূম লেগেছে হৃৎ কমলে | অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষা |
| হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ | আধুনিক সমাজের বিদ্রূপ |
| মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয় | সামাজিক সমালোচনা |
| গোটা দেশজোড়া জউঘর | দেশ ও সমাজ ভাবনা |
| প্রতি প্রশ্নে কেঁপে ওঠে ভিটে | অনিশ্চয়তা ও শিকড়ের টান |
প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক রচনা
| বইয়ের নাম | বিষয় |
|---|---|
| কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক | রবীন্দ্রনাথের নাটকের বিশ্লেষণ |
| ছন্দোময় জীবন | বাংলা ছন্দ ও তাল |
| ভিন্ন রুচির অধিকার | সাহিত্যিক রুচি ও স্বাধীনতা |
| ঐতিহ্যের বিস্তার | বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য |
| ছন্দের বারান্দা | কাব্যিক মাত্রার অনুসন্ধান |
| এই শহরের রাখাল | নগরজীবন ও সংস্কৃতি |
| এ আমির আবরণ | আত্মপরিচয় ও সাহিত্যভাবনা |
শিশুসাহিত্য
| বইয়ের নাম | বিশেষ তথ্য |
|---|---|
| ছোট্ট একটা স্কুল | শিশুদের জন্য রচিত |
| অল্পবয়স কল্পবয়স | শিশুদের জন্য রচিত |
| সকালবেলার আলো | শিশুদের জন্য রচিত |
| সুপুরিবনের সারি | শিশুদের জন্য রচিত |
| শহর পথের ধুলো | শিশুদের জন্য রচিত |
| শব্দ নিয়ে খেলা | ছদ্মনাম ‘কুন্তক’-এ রচিত |
| কথা নিয়ে খেলা | ছদ্মনাম ‘কুন্তক’-এ রচিত |
প্রধান পুরস্কার ও সম্মাননা
| পুরস্কারের নাম | সাল | প্রদানকারী সংস্থা |
|---|---|---|
| সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার | ১৯৭৭ | সাহিত্য অকাদেমি, ভারত |
| রবীন্দ্র পুরস্কার | ১৯৮৯ | পশ্চিমবঙ্গ সরকার |
| কবীর সম্মান | ১৯৯২ | মধ্যপ্রদেশ সরকার |
| সরস্বতী সম্মান | ২০০০ | কে. কে. বিড়লা ফাউন্ডেশন |
| পদ্মভূষণ | ২০১১ | ভারত সরকার |
মূল অবদান
| ক্ষেত্র | অবদান |
|---|---|
| কবিতা | রবীন্দ্র প্রভাবের সাথে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনার সমন্বয় |
| সমালোচনা | রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা ও বিশ্লেষক |
| ছন্দশাস্ত্র | বাংলা ছন্দ ও মাত্রা বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা |
| শিশুসাহিত্য | শিশুদের জন্য ভাষাকে আনন্দময় ও কল্পনাপ্রবণ করে তোলা |
| শিক্ষাক্ষেত্র | যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা |