
উৎস:
‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের ষোলো সংখ্যক কবিতা। কবিতাটির রচনাকাল ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি।
প্রেক্ষাপট:
মুসোলিনির নির্দেশে ফ্যাসিস্ট ইতালি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) আক্রমণ করে। এই আগ্রাসনের নৃশংসতা তখন বিশ্বজুড়ে বিবেকবান মানুষদের আলোড়িত করেছিল। ইতালীয় বাহিনী শুধু সামরিক শক্তি নয়, নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র পর্যন্ত ব্যবহার করে নিরীহ আফ্রিকানদের উপর। সাম্রাজ্যবাদী এই নৃশংস আক্রমণের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। মানবতার লাঞ্ছনায় তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন।
এই আক্রমণের কিছুদিন পরে বিশিষ্ট কবি ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-সচিব অমিয় চক্রবর্তী ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর এক পত্রে রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেন — “আমার কেবলই মনে হচ্ছিল আফ্রিকায় এই Tribe Eternal নিয়ে আপনি যদি একটি কবিতা লেখেন। আফ্রিকা সম্পর্কে আপনার কোনো কবিতা নেই, এইরকম কবিতা পেলে কী রকম আনন্দ হবে বলতে পারি না।”
অন্তরস্থিত ক্ষোভ আর এই পত্রানুরোধ রবীন্দ্রনাথের কলমে সাম্রাজ্যবাদী হানাহানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের লাভাস্রোত প্রবাহিত করে দিল। পত্র পাওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, ১৯৩৭-এর ৮ ফেব্রুয়ারি, তিনি লিখলেন ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি। তারই নান্দনিক শিল্পিত রূপ এই ‘আফ্রিকা’ কবিতা।
‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে:
‘পত্রপুট’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে। এটি রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ পর্বের কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে একটি। এই কাব্যগ্রন্থে কবি গদ্যছন্দের বিশেষ ব্যবহার করেছেন — যা তাঁর শেষ জীবনের কাব্যরীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি পরবর্তীকালে ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের পরিমার্জিত সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়।
কবিতার বিষয়বস্তু ও তাৎপর্য:
কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকার সুদূর অতীত থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুরতার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। সভ্যতার অহংকারী শ্বেতাঙ্গ শক্তির নির্মম আগ্রাসনের মুখে আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষের বেদনা ও মর্যাদার কথা কবি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। কবিতার শেষাংশে তিনি ভবিষ্যতের কাছে আশার বাণী রেখে গেছেন — একদিন মানবতার জয় হবে, লজ্জিত হবে সভ্যতার নামে অসভ্যতার ধ্বংসলীলা।
MCQ প্রশ্ন ও উত্তর
১. কার দ্বারা ধূলি পঙ্কিল হলো?
উত্তর: রক্তে অশ্রুতে মিশে।
২. কার নীচে আফ্রিকার মানবরূপ অপরিচিত ছিল?
উত্তর: কালো ঘোমটার নীচে।
৩. আফ্রিকার ক্রন্দন যে রূপ ছিল—
উত্তর: ভাষাহীন।
৪. কবির সংগীতে কী বেজে উঠেছিল?
উত্তর: সুন্দরের আরাধনা।
৫. কে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল?
উত্তর: রুদ্র সমুদ্রের বাহু।
৬. যে প্রাচী ধরিত্রীর বুক থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা কী ছিল?
উত্তর: রুদ্র সমুদ্রের বাহু।
৭. আফ্রিকার অন্তঃপুরে আলো কেমন ছিল?
উত্তর: কৃপণ।
৮. আফ্রিকা জল, স্থল ও আকাশের কী চিনেছিল?
উত্তর: দুর্বোধ সংকেত।
৯. কালো ঘোমটার নীচে কী অপরিচিত ছিল?
উত্তর: আফ্রিকার মানবরূপ।
১০. সভ্যের লোভ কেমন ছিল?
উত্তর: বর্বর।
১১. আফ্রিকা বিদ্রূপ করেছিল কীকে?
উত্তর: ভীষণকে।
১২. ‘নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে’—কারা এরা?
উত্তর: ইউরোপীয় শাসকরা।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (SAQ)
১. ‘যুগান্তের কবি’-কে আহ্বান করা হয়েছে কেন?
কবি রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদের উগ্র আস্ফালনে বিধ্বস্ত আফ্রিকার বুকে দাঁড়িয়ে হিংসা ও নৃশংসতার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমার বাণী প্রচার করার জন্য যুগান্তের কবিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর মতে, ক্ষমাই পারে মানবতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।
২. ‘শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে’—এ ঘটনা কীসের ইঙ্গিত দেয়?
মায়ের কোলে খেলায় মগ্ন শিশুরা শান্তি, নিরাপত্তা ও অনাবিল আনন্দের প্রতীক। এই চিত্র নিষ্পাপ শৈশব এবং সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনের ইঙ্গিত বহন করে।
৩. ‘প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রকৃতির অনেক নিয়ম ও রহস্য মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু নীরবে তা কাজ করে চলে। আফ্রিকার প্রকৃতিও তেমন এক রহস্যময় ইন্দ্রজালের মতো, যা তাকে উদ্দীপিত ও শক্তিশালী করেছিল।
৪. কাকে এবং কেন ‘মানহারা মানবী’ বলা হয়েছে?
কবি আফ্রিকা মহাদেশকে ‘মানহারা মানবী’ বলে উল্লেখ করেছেন। সাম্রাজ্যবাদীদের লুণ্ঠন, অপমান ও অত্যাচারে আফ্রিকার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তাই তাকে অপমানিতা মানবীরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
তিন নম্বরের প্রশ্নোত্তর
১. ‘হায় ছায়াবৃতা’—কাকে বলা হয়েছে? সে কেন ছায়াবৃত?
এখানে ‘ছায়াবৃতা’ বলতে আফ্রিকা মহাদেশকে বোঝানো হয়েছে। ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত হওয়ায় সূর্যের আলো সেখানে সহজে পৌঁছাতে পারত না। তাই আফ্রিকা ‘কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে’ বনস্পতির নিবিড় পাহারায় চিরকাল ছায়াবৃত হয়ে ছিল।
২. ‘গর্বে যারা অন্ধ’—কারা অন্ধ? তারা কোন গর্বে অন্ধ?
পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীরাই গর্বে অন্ধ ছিল। নিজেদের সভ্য ও শক্তিশালী মনে করে তারা আফ্রিকাসহ দুর্বল দেশগুলিকে জয় করে লুণ্ঠন করেছিল। এই অহংকারই তাদের অন্ধ করে তুলেছিল।
৩. ‘সভ্যের বর্বর লোভ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? সে লোভ কী করেছিল?
আফ্রিকার বিপুল খনিজ ও বনজ সম্পদ লুণ্ঠনের আকাঙ্ক্ষাকেই ‘সভ্যের বর্বর লোভ’ বলা হয়েছে। এই লোভের বশবর্তী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা আফ্রিকাকে দখল করে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালায়।
৪. ‘সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি…’—’তুমি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? সে কী করছিল?
‘তুমি’ বলতে আফ্রিকা মহাদেশকে বোঝানো হয়েছে। আফ্রিকা নিভৃত পরিবেশে প্রকৃতির রহস্য সংগ্রহ করছিল এবং জল-স্থল-আকাশের দুর্বোধ্য সংকেত চিনে নিজের শক্তি ও চেতনা গড়ে তুলছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (LAQ)
১. ‘সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য’—কে সংগ্রহ করছিল? কীভাবে ও কেন তা সংগ্রহের প্রয়োজন পড়েছিল?
সদ্য জন্ম নেওয়া আফ্রিকা মহাদেশই দুর্গমের রহস্য সংগ্রহ করছিল। সভ্যতার সূচনালগ্নে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে আফ্রিকা ছিল ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত এবং সভ্যজগত থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তাই নিভৃত অবকাশে সে নিজের মধ্যে সঞ্চয় করছিল প্রকৃতির নানা রহস্য এবং চিনে নিচ্ছিল জল, স্থল ও আকাশের দুর্বোধ্য সংকেত। আফ্রিকার চেতনাতীত মনে প্রকৃতির অদেখা বিস্ময় ও আশ্চর্য ঘটনাগুলি সচেতনতার আলো জাগিয়ে তুলছিল। প্রাকৃতিক ভয়াবহতাকে জয় করার জন্য আফ্রিকা ভয়ের মধ্যেই সৌন্দর্যের সন্ধান করেছিল। তাই কবি বলেছেন, বিরূপের ছদ্মবেশে সংগৃহীত প্রকৃতির রহস্যময় বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই আফ্রিকা যেন প্রকৃতির বিভীষিকাকে বিদ্রূপ করতে পেরেছিল। রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকাকে অরণ্যময় ও শ্বাপদসংকুল এক ছায়াচ্ছন্ন ভূখণ্ডরূপে চিত্রিত করেছেন। প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু সংগ্রহ করে আফ্রিকা নিজেকে বিভীষিকাময় রণসজ্জায় সজ্জিত করছিল। প্রকৃতির ভীষণ রূপকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় হিসেবে সে নিজেকেও আরও ভয়ংকর ও উগ্র করে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেছিল। তাই প্রকৃতির ভয়াবহ রহস্যের অনুসন্ধানকেই সে আত্মরক্ষার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এই কারণেই কবি বলেছেন— “সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য… আপনাকে উগ্র করে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায় তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে।”
২. ‘সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী’—সভ্যতার পুণ্যবাণীটি কী? কেন তাকে শেষ পুণ্যবাণী বলা হয়েছে?
সমস্ত হিংস্র প্রলাপের মধ্যে সভ্যতার পুণ্যবাণী হলো— “ক্ষমা করো”। কবির মতে, মানহারা মানবী আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে যুগান্তের কবি যখন আফ্রিকার ওপর সংঘটিত আগ্রাসন, অত্যাচার ও লুণ্ঠনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখনই সমস্ত নৈরাজ্য, নৈরাশ্য ও হিংসার অবসান ঘটবে। সভ্যতার মূল আদর্শ হলো মানবপ্রেম, সৌভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। মানুষ যেমন নিজের বাঁচার অধিকারকে মূল্য দেয়, তেমনি অন্যের বাঁচার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া প্রকৃত সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি নিজেদের পশুশক্তির অহংকারে আফ্রিকাকে লুণ্ঠন ও শোষণ করেছে। এর ফলে আফ্রিকার মানবাত্মা লাঞ্ছিত হয়েছে এবং সভ্যতার গায়ে লেগেছে রক্তের দাগ। রক্ত ও অশ্রুর কর্দমাক্ত ইতিহাস আফ্রিকার বুকে অপমানের চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। কবি এই নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতাকেই ‘হিংস্র প্রলাপ’ বলে অভিহিত করেছেন। শান্তি ও সাম্যের আদর্শে উদ্বুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, এই হিংসা ও অন্যায়ের অবসান ঘটানোর একমাত্র পথ হলো আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা। যখন সভ্যতা কলঙ্কে নিমজ্জিত হয়, তখন নতমস্তকে ক্ষমা চাওয়াই হয়ে ওঠে তার শেষ ও শ্রেষ্ঠ কর্তব্য। ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়েই সমস্ত অন্যায়, হিংসা ও বিদ্বেষ শুদ্ধ হতে পারে। তাই কবি রবীন্দ্রনাথ একে সভ্যতার ‘শেষ পুণ্যবাণী’ বলে উল্লেখ করেছেন।