কবি পরিচিতি:-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন একাধারে বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার ও দার্শনিক। জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ভারতী ও বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।
শিক্ষাজীবন ও বিলেতযাত্রা
রবীন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন পড়েন। এরপর তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে আইন অধ্যয়নের জন্য যান, কিন্তু ডিগ্রি সম্পন্ন না করেই ফিরে আসেন। সেখান থেকে ইংরেজি ও স্কটিশ সাহিত্য এবং সংগীতের মর্ম আয়ত্ত করে ভারতে ফিরে আসেন।
উপাধি ও স্বীকৃতি
তিনি গীতাঞ্জলি-র জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হওয়ায় তাঁকে ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র — ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা।
সাহিত্যকর্মের বিস্তার
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মূলত একজন কবি। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাব্যরচনা শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। তবে বাঙালি সমাজে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রধানত সংগীতস্রষ্টা হিসেবে — রবীন্দ্রনাথ প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা রবীন্দ্র রচনাবলী নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর সামগ্রিক চিঠিপত্র উনিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রবর্তিত নৃত্যশৈলী “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত।
কাব্যগ্রন্থ
কবির প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলি হলো — সন্ধ্যাসঙ্গীত, প্রভাতসঙ্গীত, ছবি ও গান, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী এবং কড়ি ও কোমল। ১৮৮৮ থেকে ১৮৯৬ — মাত্র আট বছরে কবি প্রতিভার যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে তারই চিহ্ন সুমুদ্রিত — মানসী, সোনার তরী, চিত্রা ও চৈতালি-তে। গীতাঞ্জলি পর্বের প্রধান তিনখানি কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য ও গীতালি; ১৯১৬-তে বলাকা, ১৯২৫-এ পূরবী এবং ১৯২৯-এ মহুয়া। ‘পুনশ্চ’ থেকে রবীন্দ্রকাব্যের শেষ পর্বের শুরু — এ পর্বের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো শেষ সপ্তক, প্রান্তিক, নবজাতক, সানাই, রোগশয্যায়, আরোগ্য ইত্যাদি।
উপন্যাস
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। এগুলি হলো: করুণা (১৮৭৭), বৌ-ঠাকুরাণীর হাট (১৮৮৩), রাজর্ষি (১৮৮৭), চোখের বালি (১৯০৩), নৌকাডুবি (১৯০৬), প্রজাপতির নির্বন্ধ (১৯০৮), গোরা (১৯১০), ঘরে-বাইরে (১৯১৬), চতুরঙ্গ (১৯১৬) এবং পরবর্তীতে যোগাযোগ, শেষের কবিতা, দুই বোন, মালঞ্চ ও চার অধ্যায়।
ছোটগল্প ও নাটক
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটগল্পের জনক হিসেবে বিবেচিত। গল্পগুচ্ছ তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন। নাটকের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য — রক্তকরবী, ডাকঘর, বিসর্জন, মুক্তধারা, রাজা, অচলায়তন প্রভৃতি।
শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী
শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শ্রীনিকেতনে পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরে অবস্থিত। প্রকৃতির কোলে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষাদানের যে আদর্শ তিনি পোষণ করতেন, শান্তিনিকেতন ছিল তারই বাস্তব রূপ।
চিত্রকলা
জীবনের শেষ পর্বে, প্রায় সত্তর বছর বয়সের পর থেকে, রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলায় মনোযোগ দেন এবং বিশেষ স্বতন্ত্র শৈলীতে তিন হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছিলেন, যা ইউরোপে প্রদর্শিত হয়ে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
বিশ্বভ্রমণ ও মানবতাবাদ
তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা — বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রতীক, আবার একই সঙ্গে বিশ্বমানবতার এক অসামান্য প্রতিনিধি। জীবদ্দশায় তিনি পাঁচটি মহাদেশের ত্রিশেরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং সর্বত্র বাংলা সাহিত্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির দূত হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ উপাধি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
মৃত্যু
দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাড়িতেই তাঁর জীবনাবসান হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত বই ও সাহিত্যকর্ম
| বিভাগ | গ্রন্থ/রচনা | প্রকাশের বছর | সংক্ষিপ্ত পরিচিতি |
|---|---|---|---|
| কবিতা | গীতাঞ্জলি | ১৯১০ | এই কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। |
| কবিতা | মানসী | ১৮৯০ | রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ, যা তাঁকে বিশিষ্ট কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। |
| কবিতা | সোনার তরী | ১৮৯৪ | মানবজীবন ও দর্শনের গভীর ভাবনায় সমৃদ্ধ এক অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ। |
| উপন্যাস | গোরা | ১৯১০ | জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, পরিচয় ও সমাজসংস্কারের বিষয় নিয়ে রচিত বিখ্যাত উপন্যাস। |
| উপন্যাস | চোখের বালি | ১৯০৩ | প্রেম, সম্পর্ক ও তৎকালীন সমাজে বিধবাদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস। |
| উপন্যাস | ঘরে বাইরে | ১৯১৬ | স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে রাজনীতি, দেশপ্রেম ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কাহিনি। |
| উপন্যাস | শেষের কবিতা | ১৯২৯ | আধুনিক চিন্তাধারায় রচিত এক জনপ্রিয় প্রেমের উপন্যাস। |
| ছোটগল্প | কাবুলিওয়ালা | ১৮৯২ | এক আফগান ফলব্যবসায়ী ও এক ছোট্ট বাঙালি মেয়ের হৃদয়স্পর্শী সম্পর্কের গল্প। |
| নাটক | চিত্রাঙ্গদা | ১৮৯২ | মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে রচিত বিখ্যাত নৃত্যনাট্য। |
| নাটক | ডাকঘর | ১৯১২ | স্বাধীনতা, আশা ও মানবমনের মুক্তির প্রতীকী নাটক। |
| শিক্ষামূলক গ্রন্থ | সহজ পাঠ | ১৯৩০ | বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য শিশুদের অন্যতম জনপ্রিয় পাঠ্যগ্রন্থ। |
| সংগীত | রবীন্দ্রসঙ্গীত | বিভিন্ন সময়ে | রবীন্দ্রনাথ প্রায় ২,০০০-এরও বেশি গান রচনা করেন, যা রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে পরিচিত। |
| জাতীয় সংগীত | জন গণ মন | ১৯১১ | পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। |
| জাতীয় সংগীত | আমার সোনার বাংলা | ১৯০৫ | বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। |
