জ্ঞান চক্ষু

জ্ঞানচক্ষু আশাপূর্ণা দেবী

ভূমিকা :-

কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল। নতুন মেসোমশাই, মানে যাঁর সঙ্গে এই কদিন আগে তপনের ছোটোমাসির বিয়ে হয়ে গেল দেদার ঘটাপটা করে, সেই তিনি নাকি বই লেখেন। সে সব বই নাকি ছাপাও হয়। অনেক বই ছাপা হয়েছে মেসোর। তার মানে — তপনের নতুন মেসোমশাই একজন লেখক। সত্যিকার লেখক।

জলজ্যান্ত একজন লেখককে এত কাছ থেকে কখনো দেখেনি তপন। লেখকরা যে তপনের বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর মতো মানুষ, এ বিষয়ে সন্দেহ ছিল তপনের। কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের। আশ্চর্য, কোথাও কিছু উলটোপালটা নেই, অন্য রকম নেই, একেবারে নিছক মানুষ। সেই ওঁদের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খেতে বসেই ‘আরে ব্যস, এত কখনো খাওয়া যায়?’ বলে অর্ধেক তুলিয়ে দেন, চানের সময় চান করেন এবং ঘুমের সময় ঘুমোন।

মেসোমশাই কলেজের প্রফেসার, এখন ছুটি চলছে তাই শ্বশুরবাড়িতে রয়ে গেছেন কদিন। মামার বাড়িতে এই বিয়ে উপলক্ষেই এসেছে তপন, আর ছুটি আছে বলেই রয়ে গেছে। তাই অহরহই জলজ্যান্ত একজন লেখককে দেখবার সুযোগ হচ্ছে তপনের। আর সেই সুযোগেই দেখতে পাচ্ছে তপন — লেখক মানে কোনো আকাশ থেকে পড়া জীব নয়, তপনদের মতোই মানুষ। তা হলে তপনেরই বা লেখক হতে বাধা কী?

দুপুরবেলা, সবাই যখন নিথর নিথর, তখন তপন আস্তে একটি খাতা আর কলম নিয়ে তিনতলার সিঁড়িতে উঠে গেল, আর তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, একাসনে বসে লিখেও ফেলল আস্ত একটা গল্প। লেখার পর যখন পড়ল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের, মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। এ যে সত্যিই হুবহু গল্পের মতোই লাগছে! তার মানে সত্যিই একটা গল্প লিখে ফেলেছে তপন। তার মানে তপনকে এখন ‘লেখক’ বলা চলে।

ভয়ানক উত্তেজনায় দুড়দুড়িয়ে নীচে নেমে এসে ছোটোমাসিকেই বলে বসে, “ছোটোমাসি, একটা গল্প লিখেছি।” ছোটোমাসিই তার চিরকালের বন্ধু। কিন্তু বিয়ে হয়ে ছোটোমাসি যেন একটু মুরুব্বি মুরুব্বি হয়ে গেছে, তাই গল্পটা সবটা না পড়েই বেশ পিঠ চাপড়ানো সুরে বলে, “ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে! কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?” তপন মনে মনে রাগ হলেও কিছু বলতে পারে না। ছোটোমাসি বলে, “রোস, তোর মেসোমশাইকে দেখাই।”

মেসোমশাই গল্পটি পড়ে বললেন, “তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু কারেকশান করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।” তপন প্রথমটা ভাবে ঠাট্টা। কিন্তু মেসো বললেন, “আমি বললে ‘সন্ধ্যাতারা’র সম্পাদক না করতে পারবে না। ঠিক আছে তপন, তোমার গল্প আমি ছাপিয়ে দেব।” মাসি বলে, “তা হলে বাপু তুমি ওর গল্পটা ছাপিয়ে দিও — মেসোর উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।”

বিকেলে চায়ের টেবিলে সবাই তপনের গল্পের কথা শুনে হাসে। কিন্তু মেসো বলেন, “না-না, তপনের হাত আছে, চোখও আছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা গল্প লিখতে গেলেই হয় রাজারানির গল্প লেখে, নয়তো খুন-জখম-অ্যাকসিডেন্ট। তপন যে সেদিকে যায়নি, শুধু তার ভর্তি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির বিষয় নিয়ে লিখেছে — এটা খুব ভালো।” তারপর ছুটি ফুরোলে মেসো গল্পটি নিয়ে চলে গেলেন। তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।

বাড়িতে তপনের নাম হয়ে গেছে কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী। আর উঠতে বসতে ঠাট্টা করছে সবাই — “তোর হবে, হাঁ বাবা তোর হবে।” তবু এইসব ঠাট্টা-তামাশার মধ্যেই তপন আরো দু’তিনটে গল্প লিখে ফেলেছে। ছুটি ফুরিয়ে এসেছে, হোম টাস্ক হয়ে ওঠেনি, তবু লিখছে। লুকিয়ে লিখছে। যেন নেশায় পেয়েছে।

তারপর একদিন ছোটোমাসি আর মেসো বেড়াতে এল, হাতে এক সংখ্যা ‘সন্ধ্যাতারা’। বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের। সত্যিই কি তাই? সূচিপত্রে নাম রয়েছে — “প্রথম দিন (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়।” সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘোরে, সকলেই একবার করে চোখ বোলায় আর বলে, “বারে, চমৎকার লিখেছে তো।”

মেসো অবশ্য মৃদু মৃদু হাসেন, বলেন, “একটু-আধটু কারেকশান করতে হয়েছে অবশ্য। নেহাত কাঁচা তো?” ক্রমশ সেই কারেকশানের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাবা বলেন, “তাই। তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো!” মেজোকাকু বলেন, “তা ওরকম একটি লেখক মেসো থাকা মন্দ নয়।”

মা বলেন, “কই তুই নিজের মুখে একবার পড় তো তপন, শুনি!” এতক্ষণে বইটা নিজের হাতে পায় তপন। কিন্তু পড়তে গিয়ে থমকে যায় সে। এসব কী পড়ছে তপন? এ কার লেখা? এর প্রত্যেকটি লাইন তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত। এর মধ্যে তপন কোথায়? তার মানে মেসো তপনের গল্পটিকে আগাগোড়াই কারেকশান করেছেন — অর্থাৎ নতুন করে লিখেছেন, নিজের পাকা হাতে কলমে।

তপন বইটা ফেলে রেখে চলে যায়। ছাদে উঠে গিয়ে শার্টের তলাটা তুলে চোখ মোছে। আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। এই দুঃখের মুহূর্তে গভীরভাবে সংকল্প করে তপন — যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয়, তো নিজে গিয়ে দেবে। নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক। তপনকে যেন আর কখনো শুনতে না হয় “অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে।” আর তপনকে যেন নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়তে না হয়। তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের কিছু নেই।

জ্ঞানচক্ষু — MCQ প্রশ্নোত্তর – লেখক : আশাপূর্ণা দেবী

1. তপনের নতুন মেসোমশাই কী ছিলেন?

A. ডাক্তার
B. শিক্ষক
C. লেখক
D. উকিল
উত্তর: (C) লেখক

2. নতুন মেসোমশাই কোথায় কর্মরত ছিলেন?

A. স্কুলে
B. কলেজে
C. অফিসে
D. ব্যাংকে
উত্তর: (B) কলেজে

3. তপনের লেখা গল্পটি প্রথমে কে পড়েছিল?

A. মেসোমশাই
B. বাবা
C. ছোটোমাসি
D. মেজোকাকু
উত্তর: (C) ছোটোমাসি

4. তপন কোথায় বসে গল্পটি লিখেছিল?

A. ছাদে
B. বাগানে
C. তিনতলার সিঁড়িতে
D. বারান্দায়
উত্তর: (C) তিনতলার সিঁড়িতে

5. তপনের গল্প ছাপানোর কথা কে বলেছিলেন?

A. বাবা
B. মেসোমশাই
C. ছোটোমাসি
D. বন্ধু
উত্তর: (B) মেসোমশাই

6. তপনের গল্প কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল?

A. দেশ
B. সন্দেশ
C. কিশোর ভারতী
D. সন্ধ্যাতারা
উত্তর: (D) সন্ধ্যাতারা

7. তপনের প্রকাশিত গল্পের নাম কী?

A. প্রথম লেখা
B. প্রথম দিন
C. নতুন সকাল
D. জ্ঞানচক্ষু
উত্তর: (D) জ্ঞানচক্ষু

8. গল্পে ‘কারেকশন’ শব্দটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

A. গল্প বাতিল করা
B. গল্প সম্পাদনা ও সংশোধন করা
C. গল্প মুখস্থ করা
D. গল্প অনুবাদ করা
উত্তর: (B) গল্প সম্পাদনা ও সংশোধন করা

9. তপনের গল্প ছাপা হওয়ার খবর শুনে বাড়ির লোকজন কী করেছিল?

A. রাগ করেছিল
B. অবিশ্বাস করেছিল
C. আনন্দ প্রকাশ করেছিল
D. চুপ ছিল
উত্তর: (C) আনন্দ প্রকাশ করেছিল

10. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের লেখক কে?

A. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
B. আশাপূর্ণা দেবী
C. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
D. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উত্তর: (B) আশাপূর্ণা দেবী